শওকতের কলমে মনের কথা
কিছু কথা মানুষ কাউকে বলতে পারে না।
কিছু কথা বলার মতো মানুষ থাকে না।
কিছু কথা বলার সাহস থাকে না।
আবার কিছু কথা আছে—যেগুলো মুখে বলা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।
সেই কথাগুলোই কখনো কখনো কলমের কাছে এসে বসে।
“শওকতের কলমে মনের কথা” তেমনই কিছু কথার জায়গা।
এখানে আমি কোনো বড় লেখক হওয়ার চেষ্টা করি না। কোনো গুরুগম্ভীর জ্ঞান বিতরণেরও ইচ্ছে নেই। আমি শুধু আমার দেখা পৃথিবীটাকে, আমার অনুভব করা মানুষগুলোকে, আমার ভেতরে জমে থাকা প্রশ্নগুলোকে—যতটা পারি সহজ ভাষায় লিখে যেতে চাই।
কখনো হয়তো লিখব খুব ছোট একটি ঘটনা নিয়ে। অথচ সেই ছোট ঘটনাটিই হয়তো আমার মনে বড় কোনো প্রশ্ন তৈরি করেছে।
কখনো লিখব মানুষের আচরণ নিয়ে।
কখনো সম্পর্ক নিয়ে।
কখনো ভালোবাসা নিয়ে।
কখনো একাকিত্ব নিয়ে।
কখনো সমাজের কোনো অসঙ্গতি নিয়ে।
আবার কখনো এমন কোনো কথা লিখব, যার কোনো বিশেষ বিষয়ই নেই—শুধু মনটা সেদিন কিছু বলতে চেয়েছে।
আর সেই বলার ভাষাটাই হবে—আমার কলম।
আমি কেন লিখি?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও পুরোপুরি জানি না।
হয়তো লিখি, কারণ কিছু অনুভূতি বুকের মধ্যে রেখে দিলে ভারী হয়ে যায়।
হয়তো লিখি, কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর মানুষের কাছে পাওয়া যায় না—তাই কাগজের কাছে বসে উত্তর খুঁজতে ইচ্ছে করে।
হয়তো লিখি, কারণ পৃথিবীকে আমি যেভাবে দেখি, সবাই সেভাবে দেখে না। আবার অন্য মানুষ যেভাবে দেখে, আমিও হয়তো সেভাবে দেখি না।
এই ভিন্ন দেখাগুলোর মাঝেই তো জীবনের সৌন্দর্য।
আমি বিশ্বাস করি, মানুষের ভেতরের কথাগুলো কখনো একেবারে একা নয়। আমার যে কষ্ট, অন্য কারও জীবনেও হয়তো সেই কষ্টের অন্য একটি গল্প আছে। আমার যে আনন্দ, অন্য কারও চোখেও হয়তো একই আনন্দের আলো জ্বলে। আমার যে অভিমান, পৃথিবীর কোথাও হয়তো আরও অনেক মানুষ একই অভিমান বুকে নিয়ে নীরবে হাঁটে।
তাই নিজের কথা লিখতে গিয়ে কখনো কখনো অন্য অনেক মানুষের কথাও লিখে ফেলি।
এই লেখাগুলো কার জন্য?
প্রথমত, নিজের জন্য।
কারণ মানুষ নিজের জীবনের কিছু মুহূর্ত ধরে রাখতে চায়। ছবি দিয়ে সব মুহূর্ত ধরে রাখা যায় না। কিছু স্মৃতি শুধু শব্দেই বেঁচে থাকে।
দ্বিতীয়ত, তাদের জন্য যারা পড়বেন।
হয়তো কোনো এক সন্ধ্যায় আপনি একা বসে আছেন। চারপাশে অনেক মানুষ, অথচ ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা। হঠাৎ আমার লেখা কোনো একটি বাক্য আপনার নিজের কথার মতো মনে হলো।
হয়তো আপনি মনে মনে বলবেন—
“এ কথাটা তো আমিও বলতে চেয়েছিলাম!”
সেই মুহূর্তটুকুই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
লেখক তখন আর একা থাকেন না। তার কথার ভেতর দিয়ে একজন পাঠক এসে পাশে বসেন।
সব কথা কি সুন্দর হবে?
না।
সব কথা সুন্দর হওয়ার দরকারও নেই।
কিছু কথা কষ্টের।
কিছু কথা অস্বস্তির।
কিছু কথা হয়তো তিক্ত।
কিছু কথা হয়তো নিজের কাছেই লজ্জার।
মানুষ তো শুধু আনন্দ দিয়ে তৈরি নয়।
আমাদের ভেতরে যেমন ভালোবাসা আছে, তেমনি ক্ষোভও আছে। যেমন স্বপ্ন আছে, তেমনি হতাশাও আছে। যেমন ক্ষমা করার ক্ষমতা আছে, তেমনি কোনো কোনো ক্ষত বহু বছর পরও শুকোয় না।
আমি সেই মানুষটার কথাই লিখতে চাই—যে বাইরে থেকে স্বাভাবিক, কিন্তু ভেতরে অনেক গল্প লুকিয়ে রাখে।
আমার লেখায় আমি কাকে খুঁজি?
মানুষকে।
সফল মানুষকে নয় শুধু। ব্যর্থ মানুষকেও।
হাসতে থাকা মানুষকে নয় শুধু। চুপ করে থাকা মানুষকেও।
যে মানুষটি প্রতিদিন নিজের দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে অথচ তার কষ্টের কথা কেউ জিজ্ঞেস করছে না—তার গল্পও আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
যে বাবা সন্তানের জন্য নিজের ইচ্ছেগুলো বিসর্জন দেন, যে মা নিজের ক্লান্তি লুকিয়ে পরিবারের মুখে হাসি দেখতে চান, যে তরুণটি হাজার স্বপ্ন নিয়ে পথে নামে অথচ বারবার বাস্তবতার কাছে হেরে যায়, যে মানুষটি ভালোবেসে প্রতারিত হয়েও ভালোবাসতে ভুলে যায় না—তাদের প্রত্যেকের ভেতরেই একটি গল্প আছে।
আমি সেই গল্পগুলো শুনতে চাই।
আর নিজের গল্পটাও বলতে চাই।
কখনো প্রতিবাদ, কখনো ভালোবাসা
“মনের কথা” মানে শুধু কোমল অনুভূতি নয়।
অন্যায় দেখলে ক্ষোভ হয়।
অবিচার দেখলে প্রশ্ন জাগে।
ভণ্ডামি দেখলে বিরক্তি আসে।
কখনো নিজের ভুলের জন্য নিজের ওপরই রাগ হয়।
সেসব কথাও এখানে থাকবে।
তবে আমার প্রতিবাদ কাউকে ছোট করার জন্য নয়। আমার প্রশ্ন কাউকে অপমান করার জন্য নয়।
আমি শুধু বিশ্বাস করি—চুপ করে থাকা সবসময় ভদ্রতা নয়; কখনো কখনো কথা বলাও দায়িত্ব।
আবার সব কথা চিৎকার করে বলতে হয় না। কিছু কথা খুব আস্তে বললেও তার প্রতিধ্বনি অনেক দূর পর্যন্ত যায়।
আমার কলম সেই নীরব প্রতিধ্বনিটুকু হতে চায়।
আর ভালোবাসা?
ভালোবাসা ছাড়া মানুষের গল্প কি কখনো সম্পূর্ণ হয়?
ভালোবাসা শুধু প্রেমের গল্প নয়।
একজন বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করাও ভালোবাসা।
মায়ের ফোন না ধরতে পারার অপরাধবোধও ভালোবাসা।
বাবার পুরোনো জামাটা যত্ন করে রেখে দেওয়াও ভালোবাসা।
হারিয়ে যাওয়া কোনো মানুষের স্মৃতি মনে পড়লে বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে যাওয়াও ভালোবাসা।
জীবনের সবচেয়ে সাধারণ মুহূর্তগুলোর মধ্যেই অনেক সময় সবচেয়ে অসাধারণ অনুভূতিগুলো লুকিয়ে থাকে।
আমি সেই অনুভূতিগুলোকে শব্দে ধরতে চাই।
“শওকতের কলমে”—কেন?
কারণ এটি কোনো প্রতিষ্ঠানের বিবৃতি নয়।
এটি কোনো সংবাদমাধ্যমের নিরপেক্ষ রিপোর্টও নয়।
এটি একজন মানুষের ব্যক্তিগত জানালা।
এই জানালা দিয়ে আমি পৃথিবীকে দেখি। কখনো আকাশ দেখি, কখনো বৃষ্টি দেখি, কখনো মানুষের মুখ দেখি, কখনো মানুষের মুখোশও দেখি।
আমি যা দেখি, তা-ই সবসময় সত্য—এমন দাবি আমার নেই।
আমার দেখা হয়তো অসম্পূর্ণ। আমার ভাবনাও ভুল হতে পারে।
তবু আমি লিখব।
কারণ আমি মনে করি, ভুল হতে পারে বলে ভাবা বন্ধ করে দেওয়া যায় না।
বরং নিজের ভাবনাকে শব্দে প্রকাশ করলে অন্যের ভাবনার সঙ্গে তার দেখা হয়। সেখান থেকেই জন্ম নেয় নতুন উপলব্ধি।
শওকতবিডি আর এই কলম
শওকতবিডি আমার কাছে শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়।
এটি আমার দীর্ঘদিনের ভাবনা, কাজ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, সৃষ্টিশীলতা এবং নিজের মতো করে কিছু করার একটি জায়গা।
কখনো এখানে প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছি, কখনো মানুষের প্রয়োজনের জন্য কোনো টুল বানিয়েছি, কখনো লিখেছি, কখনো নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করেছি।
কিন্তু সব কাজের আড়ালেই একজন মানুষ থাকে।
সেই মানুষটিরও তো কিছু কথা আছে।
“শওকতের কলমে মনের কথা” সেই মানুষটির কাছে ফিরে যাওয়ার একটি পথ।
কোডের বাইরে। কাজের বাইরে। পরিচয়ের বাইরে।
শুধু একজন মানুষ হিসেবে—একজন মানুষের কথা।
শেষ পর্যন্ত এটি কী?
হয়তো একটি কলাম।
হয়তো একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি।
হয়তো কিছু এলোমেলো ভাবনা।
হয়তো কিছু না-বলা কথা।
হয়তো আমার জীবনের কিছু পৃষ্ঠা, যেগুলো একদিন অপরিচিত কোনো পাঠক এসে পড়ে যাবেন।
আমি জানি না, এই লেখাগুলো কোথায় গিয়ে থামবে।
হয়তো কোনো দিন লিখতে বসে মনে হবে, আজ কিছুই বলার নেই।
আবার কোনো দিন হয়তো একটি ছোট্ট ঘটনা সারারাত ঘুমাতে দেবে না—আর সকালে কলম হাতে নিতে হবে।
তবু লিখব।
কারণ কিছু কথা লিখে না রাখলে হারিয়ে যায়।
কিছু অনুভূতি সময়ের সঙ্গে মুছে যায়।
কিছু মানুষ চলে যায়।
কিছু সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়।
কিন্তু শব্দ থেকে যায়।
আর তাই—
যা বলতে পারিনি, তা লিখব।
যা ভুলতে পারিনি, তা লিখব।
যা দেখে প্রশ্ন জেগেছে, তা লিখব।
যা ভালোবেসেছি, তাও লিখব।
আর কখনো কখনো—কোনো কারণ ছাড়াই, শুধু মন চেয়েছে বলে লিখব।
আপনি পড়বেন।
হয়তো ভালো লাগবে।
হয়তো ভালো লাগবে না।
হয়তো আমার সঙ্গে একমত হবেন।
হয়তো তীব্রভাবে দ্বিমত করবেন।
তবু যদি কোনো একটি লেখা পড়ে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যান, নিজের জীবনের দিকে ফিরে তাকান, অথবা মনে মনে বলেন—
“আমার মনেও তো এমন একটা কথা ছিল…”
তাহলেই বুঝব, আমার মনের কথাটি একা থাকেনি।
সেটি পৌঁছে গেছে আরেকটি মনে।
এই তো—শওকতের কলমে মনের কথা।
এখনো কোনো রিভিউ নেই — প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!

