এলোমেলো ভাবনার দশ দিগন্ত
আমি একটু বোকা এবং ভিতু ধরনের মানুষ। অন্য দশজনের মতো সুন্দর সুন্দর সৃষ্টিশীল ভাবনা মাথায় কাজ করেনা। অন্য দশ যা পছন্দ করে প্রায় সময় তা আমার অপছন্দ। আমি যা পছন্দ করি তা অনেকের অপছন্দের।
চারপাশের কোলাহল, অসংগতি আর অনিশ্চয়তার ভিড়ে আমার মাথায় যে ছিটে ফোটা চিন্তার সুতোগুলো আছে, তা প্রায়ই ছিঁড়ে যায়। আমার মনে হয় রাষ্ট্র থেকে সমাজ, মানুষের ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সমষ্টিগত নৈতিকতা – সব কিছু কেমন যেন এক অদ্ভুত অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
এসব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে লেখলে এক মহাকাব্যও সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে তাই সংক্ষেপেই একটু আধটু লিখলাম :
১. রাষ্ট্রযন্ত্র বিকল ও ক্ষমতার বৃত্ত
রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নাগরিকের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা। অথচ সময়ের পরিক্রমায় সেই রাষ্ট্র যেন কেবলই কিছু ক্ষমতাবানের ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইন, বিচার ও প্রশাসন – সবকিছুই যখন নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সুবিধা রক্ষায় ব্যস্ত থাকে, তখন সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব কেবল কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আর কয়েক বছর পর পর প্রখর রৌদ্রে দাড়িয়ে একটা ভোট দেয়া ছাড়া আর যেন কিছুই নয়।
২. সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘুন পোকা
আমাদের সমাজব্যবস্থা একসময় সহানুভূতি ও মেলবন্ধনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। আজ সেখানে জায়গা করে নিয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা ও পরশ্রীকাতরতা। প্রতিবেশী পাশের ঘরে না খেয়ে মারা গেলেও খবর রাখার সময় নেই, কিন্তু অন্যের পতন দেখে আনন্দ পাওয়ার মানসিকতা ছড়িয়ে পড়েছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
৩. নিরন্ন ও নীরব বোকাচোদা জনগণ
জনগণকে বলা হয় সকল ক্ষমতার উৎস, অথচ বাস্তবে তারা সবচেয়ে অসহায়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মারপ্যাঁচে পিষ্ট হয়ে মানুষ তার মৌলিক অধিকার দাবি করতেও ভয় পায়। প্রতিবাদী কণ্ঠগুলো ধীরে ধীরে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে, আর সাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছে কেবল নীরব দর্শক।
৪. দুর্নীতির কালো চাদরে আবৃত সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান
দুর্নীতি এখন আর গোপনে ঘটে না; এটি এখন একপ্রকার অধিকারের মতো চর্চা করা হয়। সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি শিক্ষার অঙ্গনেও ঘুষ ও স্বজনপ্রীতি ছাড়া কাজ হওয়া অলৌকিক ঘটনার সামিল। সিস্টেমের এমন রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি ঢুকে গেছে যে একেই অনেকে নিয়ম বলে ধরে নিচ্ছে।
৫. নীরব হাহাকার ও বেঁচে থাকার লড়াই
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, বেকারত্ব আর অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা সাধারণ পরিবারের প্রতিটি ঘরে ঘরে নীরব হাহাকার পৌঁছে দিয়েছে। মুখে হাসি বজায় রেখে মধ্যবিত্তের না-বলা কান্না আর নিম্নবিত্তের টিকে থাকার হাহাকার আজ বাতাসকে ভারী করে তুলছে। বেঁচে থাকাটাই যেখানে একমাত্র যুদ্ধ, সেখানে স্বপ্নের জায়গা কোথায়? স্বপ্ন গিয়েছে বনবাসে।
৬. রুচির দুর্ভিক্ষ ও বেলাল্লাপনা
সংস্কৃতি ও বিনোদনের নামে আজ যা পরিবেশন করা হচ্ছে, তাকে রুচির দুর্ভিক্ষ ছাড়া আর কিছু বলা যায় বলে মনে হয় না। সস্তা জনপ্রিয়তা, সস্তা বিনোদন এবং প্রকাশ্যে অনৈতিকতার চর্চাকে ‘আধুনিকতা’ বা ‘স্বাধীনতার’ বা নতুনত্বের মোড়কে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গভীর চিন্তা ও অর্থবহ সৃষ্টিকর্মের জায়গা দখল করে নিয়েছে সস্তা প্রদর্শনকামিতা।
৭. ভণ্ডামির চাদরে ঢাকা নীতি
আমাদের মুখ নীতি-নৈতিকতায় টাসা, কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ শূন্যের কোঠায়। ধর্ম, সমাজ ও আদর্শের কথা বলে যারা মঞ্চ কাঁপায়, পর্দার আড়ালে তাদের জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই দ্বিমুখী আচরণ বা ভণ্ডামিই আজ প্রতিটা মানুষের ভেতরে অট্টহাসি হাসছে।
৮. সত্যের অবমূল্যায়ন
বর্তমানে সত্য বলাটা যেন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে উঠেছে। মিডিয়া থেকে সোশ্যাল মিডিয়া – সবখানেই সত্যকে আড়াল করে সাজানো মিথ্যা উপস্থাপন করা হচ্ছে। যা সত্য, তা এখন অপ্রিয় এবং অপ্রয়োজনীয়; আর যা প্রচারমুখী propaganda, তাই বাজার পাচ্ছে বেশি। কদর বাড়ছে সেসবের।
৯. দায়িত্বহীনতার সংস্কৃতি
রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি – কোথাও জবাবদিহিতা নেই। ভুল করলে ক্ষমা চাওয়া বা দায় নেওয়ার সংস্কৃতি যেন হারিয়ে গেছে। একে অপরের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে পার পেয়ে যাওয়াটাই এখন বুদ্ধিমানের কাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
১০. সংশয় পেরিয়ে সম্ভাবনার আলো
এত ভাঙন, দুর্নীতি আর হাহাকারের মধ্যেও আশায় বুক বাধি। কেননা ইতিহাস স্বাক্ষী প্রতিটি অন্ধকারের পরই আলো এসেছে। যখন সমস্ত সিস্টেম ভেঙে পড়ে, তখনই নতুন করে গড়ার সুযোগ তৈরি হয়। সচেতনতা, সুস্থ রুচির চর্চা আর সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতাই পারে এই দশ দিগন্তের গ্লানি মুছে নতুন ভোর আনতে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের এই ক্ষয়িষ্ণু অবস্থার পেছনে আপনি কি ব্যক্তিগত নৈতিকতার পতনকে বেশি দায়ী মনে করেন, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকে?
এখনো কোনো রিভিউ নেই — প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!


