মায়ের পালঙ্ক বাবার চাদর – শওকত আকবারের কলমে একটি ভিন্ন ধরনের গল্প। আসলে যা শুধুই গল্প নয়, এ যেন বাবা মা হারা সন্তানের বুকের ভেতর জমে থাকা কষ্টের রোনাজারি ও যাপিত জীবনের উপলব্দি।
মায়ের পালঙ্ক বাবার চাদর
মানুষের জীবনের কিছু আসবাব কিংবা সামান্য বস্তু কেবল কাঠ, পেরেক, বার্নিশ কিংবা সুতোর বুনন থাকে না। তা হয়ে ওঠে একেকটি আবেগের গভীর সিন্দুক। ভালোবাসা আর ব্যাকুল বেদনার এক নীরব মহীরূহ। আমাদের পুরোনো পৈতৃক ঘরের কোণে রাখা সেগুনের যে বিরাট ভারী পালঙ্কটি ছিল সেটি আমার কাছে তেমনই এক পরম আধার। আর তার সাথে জড়িয়ে আছে বাবার রেখে যাওয়া সেই ছোপ ছোপ রং-চটা সুতির চাদরটি।
সেই পালংকের শক্ত কাঠামোর সাথে জড়িয়ে আছে আমার শৈশব ও কৈশোরের সমস্ত উত্তাপ আর সোনালী আনন্দ। কত রাতে বাইরে যখন মুষলধারে বৃষ্টি নামত, কড়কড় শব্দে মেঘ ডাকত, আমি মা আর বাবার মাঝখানে শুয়ে তাঁদের কাছে রূপকথার গল্প শুনেছি! কত দিন বাবার চওড়া বুকের ওমে মাথা রেখে, তাঁর হাতের মৃদু থাপড়ানিতে ঘুমিয়ে পড়েছি নিশ্চিন্ত মনে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে জীবনের প্রয়োজনে ঘর বদলেছে, বদলাতে হয়েছে আসবাবের রূপরেখা, কিন্তু সেই পুরোনো পালঙ্কটির প্রতি আমার মনের টান কখনো একবিন্দু কমেনি। কিন্তু পৃথিবীর নিয়ম বড় নিষ্ঠুর – সময় তো কারো জন্য এক জায়গায় থমকে থাকে না। একসময় সেই আনন্দের নিড়ে হঠাৎ নেমে এলো কালান্তক এক কৃষ্ণচ্ছায়া।
মায়ের শরীরে হঠাৎ এক দিন ধরা পড়ল দূরারোগ্য মরণব্যাধি ক্যান্সার। চোখের সামনে হাসিখুশি, প্রাণবন্ত মা দেখতে দেখতে বিছানায় মিশে যেতে লাগলেন। শেষ কটা দিন ওই সেগুনের পালঙ্কটাই হয়ে উঠেছিল মায়ের জীবনের একমাত্র ভরসা ও আশ্রয়। ক্যান্সারের তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে যখন মা নিচু স্বরে গোঙাতেন, আমি আর বাবা সারারাত জেগে পাশে বসে মায়ের মাথায় ও কপালে হাত বুলিয়ে দিতাম। জলছাপ পড়ে যাওয়া বিষণ্ন চোখে মা আমাদের দিকে তাকাতেন, যেন নিঃশব্দে বিদায়ের শেষ আয়োজন করছিলেন। একপর্যায়ে সব যন্ত্রণার চির অবসান ঘটিয়ে, ওই পালঙ্কে শুয়েই মা আমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন। ধরাধম থেকে বিদায় নিলেন চিরতরে। মায়ের বিদায়ের পর সেই ঘরে যেন আর কখনো আগের মতো আলো জ্বলেনি।

মায়ের চলে যাওয়ার পর বাবা যেন এক লহমায় প্রবীণ থেকে অতি-প্রবীণ এক নিঃসঙ্গ বৃদ্ধে পরিণত হলেন। চোখের সামনে দীর্ঘদিনের জীবনসঙ্গিনীকে হারানোর সেই গভীর শোক তিনি আর কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারেননি। মা যে বিছানায় শুয়ে শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন, বাবা সেই পালঙ্ক ছেড়ে অন্য কোনো ঘরে এক রাতের জন্যও শুতে রাজি হতেন না। দিনযাপনের সব ক্লান্তি আর অন্তহীন হাহাকার নিয়ে বাবাও একসময় শরীর এলিয়ে দিতেন সেই একই পালঙ্কে, মায়ের শুয়ে থাকা জায়গায় হাত রেখে যেন নীরব সান্ত্বনা খুঁজতেন।
বাবার জীবনের শেষ দিনগুলোতে পরিচর্যা, হাসপাতালে দিনরাত ছোটাছুটি, নামীদামী ওষুধপত্তরের বিপুল খরচ – সাধ্যের সবটুকু নিংড়ে দিয়ে আমি চেষ্টা করেছি তাঁকে সুস্থ রাখতে, অন্তত তাঁর কষ্টটুকু একটু কমাতে। কোনোদিন বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ করিনি, অন্তরে কোনো প্রকার আক্ষেপ জমতে দিইনি। কারণ আমি অন্তরের অন্তস্তল থেকে বিশ্বাস করতাম, বৃদ্ধ পিতা-মাতার সেবা করার এই পরম সুযোগ সবাই পায় না। এটা সৃষ্টিকর্তার এক অপরিসীম সৌভাগ্য ও রহমত। শেষমেশ একদিন সেই পালঙ্কে শুয়েই বাবাও মায়ের পথ ধরে ওপারে পাড়ি জমালেন।
বাবার মৃত্যুর পরও পরম করুণাময়ের অশেষ রহমত আর বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া অদেখা দোয়াই ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় মূলধন। পৈতৃক ভিটেমাটি বা বিত্ত-বাসনার বড় কোনো অংশ আমার ভাগে পড়েনি; কিন্তু ওই যে – মা-বাবার শেষ নিঃশ্বাসের মোনাজাতের বরকতে আমার ছোট সংসারটি চলছিল আলহামদুলিল্লাহ্ ভীষণ শান্তিতে ও স্বস্তিতে। আর এই কঠিন ও সুন্দর যাত্রায় আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্বল হয়ে পাশে থেকেছে আমার স্ত্রী।
আমার স্ত্রী সত্যিই খুব বড় ও পরম উদার মনের একজন মানুষ। সংসার জীবনের এতগুলো বছরে সে কোনোদিন আমার কাছে একটা অনুযোগ বা ক্ষোভ প্রকাশ করেনি। কখনো খোঁচা দিয়ে বলেনি – “তোমার বাবা তোমাকে কী দিয়ে গেলেন আর কী দিলেন না!” কিংবা “হাসপাতালে এত টাকা ঢাললে, দিনরাত এক করে সেবা করলে, অথচ বিনিময়ে তুমি শেষমেশ কী পেলে?” এই জাতীয় পার্থিব হিসাব-নিকাশের মলিনতা তার মনকে স্পর্শও করতে পারেনি। উল্টো সে সবসময় আমার হাত ধরে বলত, “মা-বাবার শেষ বয়সে তাঁদের পাশে থাকতে পারা, নিজের হাতে সেবা করার সুযোগ পাওয়া কয়জনের ভাগ্যে জোটে বলুন? আমাদের যা আছে, তাতেই আলহামদুলিল্লাহ্। তাঁদের দোয়াই আমাদের আসল সম্পদ।”
তবে মানুষের বুকের গভীর গহীনে কিছু অবুঝ আকুতি জমা হয়ে থাকে, যা টাকা-পয়সা, জমিজমা কিংবা সম্পদের পরিমাপ দিয়ে কখনোই মেটানো যায় না।
বাবা মারা যাওয়ার পর যখন পৈতৃক ঘরের জিনিসপত্র আর সামান্য যা ছিল তা ভাগাভাগির কথা উঠল, আমি বড় ভাইয়ের কাছে কোনো ধন-সম্পদ, টাকা বা দামি জিনিস দাবি করিনি। আমি শুধু দুই হাত জোড় করে মিনতি ভরা কণ্ঠে বলেছিলাম, “ভাইয়া, আমার অন্য কোনো সম্পত্তিতে কাজ নেই। আমাকে শুধু মায়ের শুয়ে থাকা, বাবার শেষ নিঃশ্বাস ফেলা ওই পুরোনো সেগুনের পালঙ্কটা দাও। ওই পালঙ্কে মা শুয়ে কষ্ট সহ্য করেছেন, ওখানেই বাবা জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন। ওটায় হাত রাখলে, ওটায় শুলে আমি আমার মা-বাবার গায়ের চেনা ঘ্রাণ পাই। ওটা আমার কাছে কোনো কাঠের আসবাব নয় ভাইয়া, ওটা আমার মা-বাবার জীবন্ত স্মৃতি।”
আমার বড় ভাই বেশ বিত্তশালী, সংসারের সিংহভাগ হিস্যাও তাঁর দখলে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আমার এই আকুল আবেদনটুকু তাঁর মন একটুও গলাতে পারেনি। অত্যন্ত রূঢ় আর স্পষ্ট কণ্ঠে তিনি আমাকে না বলে দিলেন। কারণটা আজও আমার জানা নেই – হয়তো ভাইয়ের অহংকার, কিংবা কেবলই নিজের অধিকার আঁকড়ে রাখার অহেতুক পাওয়ার লিপ্সা। কাঠের তৈরি সাধারণ একটা পালঙ্কের জন্য নিজের আপন ভাইয়ের সেই নির্মম অস্বীকৃতি আমার বুকের ভেতরটা যেন এক নিমিষে চুরমার করে দিল। পৈতৃক সম্পত্তি না পাওয়ার কোনো দুঃখ আমার মনে কোনোদিন ছিল না, কিন্তু মা-বাবার পরম স্মৃতি ও ছোঁয়া লেগে থাকা সেই পালঙ্কটা না পাওয়ার বেদনা আমার মনকে গভীরভাবে ক্ষতবিক্ষত করে দিল।
তবে উপরওয়ালার চক্র আর ভাগ্যের কী অদ্ভুত করুণা! কাঠের সেই ভারী পালঙ্কটা আমি না পেলেও, বাবার ব্যবহৃত একটি পুরোনো, হালকা খয়েরি রঙের সুতির চাদর কেমন করে যেন আমার কাছেই থেকে গিয়েছিল। চাদরটার মূল রং রোদে পুড়ে কিছুটা চটে গেছে, ধারগুলোর সেলাইয়ের সুতো উঠে এসেছে কয়েক জায়গায়, কিন্তু সেই চাদরটির প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে যেন চিরদিনের জন্য জমা হয়ে আছে আমার বাবার গায়ের সেই সুবাস – যে সুবাসে আমি ছোটবেলায় পরম নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে যেতাম। খুব সাবধানে, পরম মমতায় সেটাকে আমি আমার আলমারির সবচেয়ে সুরক্ষিত কোণে গুছিয়ে রেখে দিয়েছি।

প্রতি বছর যখন পৌষের কনকনে ঠাণ্ডা বাতাস নেমে আসে, আমি আলমারির কোণ থেকে খুব সাবধানে বাবার সেই পুরোনো চাদরটি বের করি। পুরো বছরের মধ্যে কেবল শীতের দিনগুলোতে আমি এই চাদরটি গায়ে জড়াই। শীতের নিস্তব্ধ রাতে যখন চাদরটি নিজের গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিই, মুহূর্তের মধ্যে আমার মনে হয় – বাবা যেন চাদরের সেই চেনা ওমে আমাকে আবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছেন, যেন বলছেন, “আমি তো আছি রে বাপ, তুই একা নোস।” এক অসীম, অনাবিল প্রশান্তিতে আমার পুরো বুকটা ভরে ওঠে; অঝোর ধারায় চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে স্বস্তির জল।
সেদিন রাতেও যখন পালঙ্ক না পাওয়ার কষ্টে নিঃশব্দে কাঁদছিলাম আর গায়ে বাবার সেই সুতির চাদরটি জড়িয়ে বসে ছিলাম, আমার স্ত্রী এসে আলতো করে আমার পাশে বসল। আমার চোখের জল আর গায়ে বাবার চাদর জড়িয়ে থাকার দৃশ্য দেখে সে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। সে আমার কাঁধে হাত রেখে, হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরে পরম মায়ায় বলল, “কেন এভাবে মন খারাপ করছ বল তো? যে কাঠের পালঙ্কটা ভাইয়া রেখে দিলেন, সেটা তো দিনশেষে স্রেফ কিছু শুকনা কাঠ আর বার্নিশ ছাড়া আর কিছুই নয়। মা-বাবার আসল পালঙ্ক তো কোনো পার্থিব কাঠের তৈরি হয় না গো! সেটা তৈরি হয় তাঁদের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, ত্যাগ আর শেষ নিঃশ্বাসের দোয়া দিয়ে। এই যে বাবার চাদরটা গায়ে জড়িয়ে আছ, দেখতে পাচ্ছ না বাবা কীভাবে এখনো তোমাকে আগলে রেখে পাহারা দিচ্ছেন? আর তাঁদের সেই দোয়ার অদৃশ্য পালঙ্কে তাঁরা তোমাকে সারাজীবনের জন্য চিরস্থায়ী আশ্রয় দিয়ে গেছেন। মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁরা তোমার জন্য যে দুটো হাত তুলে অঝোরে দোয়া করে গেছেন, সেই দোয়ার চেয়ে বড় কোনো নিরাপদ আশ্রয় কি এই নশ্বর পৃথিবীতে আর হতে পারে?”
স্ত্রীর এই অমূল্য কথাগুলো শোনার পর হঠাৎ যেন আমার বুকের ভেতর চেপে থাকা বিষাদের ভারী পাথরটা এক নিমেষে নেমে গেল। আমি শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে, গায়ের বাবার চাদরটা আরও একটু আঁকড়ে ধরে জানালার বাইরের গভীর আকাশের দিকে তাকালাম।
সত্যিই তো! যে সেগুনের পালঙ্কে শুয়ে মা ও বাবা এক এক করে ইহলোক ত্যাগ করেছেন, তা হয়তো রয়ে গেছে বড় ভাইয়ের অট্টালিকায় এক কোণে ধুলো জমার জন্য কিংবা শুধুই দেখানোর জন্য। কিন্তু মা-বাবার তৃপ্ত হাসিমুখ, চাদরের সুতোয় আমরণ জড়িয়ে থাকা বাবার গায়ের স্পর্শ, আর অন্তরের অন্তস্তল থেকে আসা পরম আকুল দোয়া – সে তো ছড়িয়ে আছে আমার রক্তের প্রতি ফোঁটায়, আমার প্রতিদিনের সুন্দর ও স্বাভাবিক জীবনযাপনে।
পার্থিব ‘মায়ের পালঙ্ক’ আমি পাইনি ঠিকই, কিন্তু ‘বাবার চাদর’টুকু আর মা-বাবার অশেষ দোয়ার যে পরম অনুভূতির পালঙ্কে আমি আজীবন ঘুমিয়ে আছি, পৃথিবীর কোনো মানুষের সাধ্য নেই সেই পরম আশ্রয় আমার কাছ থেকে কেড়ে নেওয়ার।
মায়ের পালঙ্ক বাবার চাদর – বাস্তবতার নিরিখে রচিত গল্পটি যদি কারো হৃদয়ে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করে একটি রিভিউ দিয়ে উৎসাহিত করতে আজ্ঞা হয়।
এখনো কোনো রিভিউ নেই — প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!


