আয়নাঘর থেকে ফিরে আসা রাজবন্দির জবানবন্ধি – গল্পটি একটি স্বাক্ষী, একটি ইতিহাস। যতদিন বাংলাদেশ বেঁচে থাকবে, ততদিন স্মৃতির পাতায় কৃৎসিত, কদাকার, বিভৎস, নির্মমতার কাটা ফুটিয়ে বাংলার ইতিহাসে কলংকিত অধ্যায়ে জায়গা করে নিবে এই আয়নাঘর। যুগে যুগে খারাপেরা যেমন ঘুটঘুটে অন্ধকারে জায়গা করে নিয়েছিলো, আয়নাঘর এবং এর তৈরির নেপথ্যের কারিগরেরাও তেমিন খারাপ অধ্যায়েই আসন করে নিবে ইতিহাসের পাতায়..
আয়না ঘর থেকে ফিরে আসা রাজবন্দির জবানবন্ধি
অন্ধকার আর নিস্তব্ধতার একটা নিজস্ব গন্ধ আছে। গত ষোলোটা বছর আমি সেই স্যাঁতসেঁতে, বোবা অন্ধকারের গন্ধ বুক ভরে টেনে নিয়ে বেঁচে ছিলাম। পৃথিবীর আলো কেমন হয়, তা আমি প্রায় ভূলেই গিয়েছিলাম।
আমাকে যখন মাটির তলার সেই কফিন থেকে বের করা হলো, তখন সূর্য নাকি চাঁদ মাথার ওপর ছিল – আমি জানি না। শুধু অনুভব করলাম খোলা বাতাস, যে বাতাসে প্রলেপ ছিল বহু বছরের রক্ত, ঘাম আর না-বলা প্রার্থনার।
আমি কোনো পেশাদার অপরাধী ছিলাম না। আমার অপরাধ ছিল – আমি ফ্যাসিবাদের শৃঙ্খল ভেঙে মানুষের ভোটাধিকার আর স্বাধীনতার কথা বলেছিলাম। ২০০৯ সালের এক একলা রাতে যখন আমাকে তুলে আনা হলো, তখন আমি এক উদীয়মান রাজনৈতিক নেতা, যার চোখে ছিল এক নতুন ভোরের স্বপ্ন।
ক্ষমতার শীর্ষমহলে বসে ভারতের সাথে হওয়া এক গোপন, অলিখিত ও দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তির সংবেদনশীল নথিপত্র আমার হাতে এসেছিল। যেখানে দেশের সার্বভৌমত্ব, বন্দর, করিডোর আর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা অন্য দেশের হাতে তুলে দেওয়ার চক্রান্ত পরিষ্কার লিখিত ছিল। তারা বুঝেছিল, এই গোপন সত্য বাইরে এলে তাদের ক্ষমতার মসনদ তাসের ঘরের মতো চুরমার হয়ে যাবে। তাই আমাকে হত্যা না করে, জ্যান্ত লাশ বানিয়ে বন্দি করে রাখা হয়েছিল এক দেওয়ালহীন, জানালাহীন কংক্রিটের খোয়ারে – যার নাম ছিল – আয়নাঘর।

২০০৯ সালের এক বৃষ্টিভেজা নভেম্বরের রাত। সময়টা আনুমানিক রাত ১২টা বাজতে ১০ মিনিট। পল্টনের ছোট কার্যালয় থেকে বের হয়ে আমি নিজের পুরনো সাদা গাড়িতে উঠছিলাম। ড্রাইভারে পাশের আসনে বসে সবেমাত্র ল্যাপটপটা ব্যাগে ঢোকাচ্ছি, গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। এমন সময় দুটি কালো রঙের হায়েস মাইক্রোবাস এসে আমার গাড়ির পথ আটকে দাঁড়াল। মুহূর্তের মধ্যে ১০-১২ জন জলপাই ও কালো পোশাকের মুখোশধারী সশস্ত্র লোক গাড়ি থেকে নেমে এলো।
কোনো ওয়ারেন্ট নেই, কোনো কথা নেই। পিস্তলের নাল সোজা আমার কপালে ঠেকানো হলো। আমি চিৎকার করার চেষ্টা করতেই মুখের ওপর চেপে বসানো হলো এক শক্ত কালো কাপড়ের মুখোশ। চোখ দুটোকে মোটা ব্ল্যাক-আউট গগলসে চেপে বাঁধা হলো, আর হাত দুটো পিঠমোড়া করে কষে বাঁধা হলো প্লাস্টিকের ক্যাবল টাই দিয়ে, যা চামড়া কেটে মাংসের গভীরে ঢুকে যাচ্ছিল।
আমাকে চাদর দিয়ে পেঁচিয়ে পশুপাখির মতো ছুড়ে ফেলা হলো মাইক্রোবাসের পেছনের ফ্লোরে। গাড়িটি দ্রুত গতিতে ছুটে চলতে শুরু করল। গাড়ির ইঞ্জিনের বিকট গর্জন আর সাইরেন ছাড়া কিছু শোনা যাচ্ছিল না।
আমি আকুতি করে জিজ্ঞেস করেছিলাম – আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? আমার অপরাধ কী?
উত্তর হিসেবে এলো একটি ভারী বুটের লাথি। যা সরাসরি লাগল আমার বুকের বাম পাশে। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। মনের ভেতরে তখন ভেসে উঠছিল আমার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর চিন্তিত চেহারা। আমার বুড়ো বাবার কাশিতে কাঁপতে থাকা কণ্ঠ। আর ছয় বছরের ছোট মেয়েটার মুখ – যারা হয়তো কোনোদিন জানতেও পারবে না আমি কোথায় হারিয়ে গেলাম!
অবশেষে গাড়ি থামল। আমাকে টেনে-হেঁচড়ে নামানো হলো। বাতাসের আর্দ্রতা আর ভারী এসি-র ঠান্ডা বাতাস বুঝিয়ে দিল আমরা মাটির নিচে কোথাও নামছি। একটি বড় লোহার দরজা খোলার বিকট শব্দ হলো – ক্যাঁঅঅঅছ! তারপর কয়েক ধাপ সিঁড়ি নিচে নামার পর আমাকে একটি ছোট জায়গায় ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়া হলো।
পেছনে বিকট শব্দে ভারী তালা লাগানোর আওয়াজ পেয়ে বুঝলাম, আমি এক জীবন্ত কবরে প্রবেশ করেছি।
যখন আমার চোখের বাঁধন পুরোপুরি খুলে দেওয়া হলো, তখন আমি তীব্র যন্ত্রনায় চোখ মেলতে পারছিলাম না। চারপাশটা স্পষ্ট হতেই আত্মা শিউরে উঠল। চার হাত বাই ছয় হাতের একটি নিশ্ছিদ্র কংক্রিটের ঘর।
দেওয়ালগুলোতে ভারী সাউন্ডপ্রুফ মোটা বোর্ডের মতো লাগানো। কোনো জানালা নেই, কোনো ভেন্টিলেটর নেই। কেবল ছাদের এক কোণ থেকে এক ধরনের অদ্ভুত নীল রঙের ড্রিম লাইট জ্বলছে। যা ২৪ ঘণ্টা, ৩৬৫ দিন একইভাবে জ্বলতে দেখেছি।

এই ঘরে দিন নেই, রাত নেই। সূর্যের আলো আসার বিন্দুমাত্র ছিদ্র নেই। ঘরের এক কোণে একটি ছোট ড্রেন আর একটি প্লাস্টিকের মগ রাখা, ওটাই শৌচাগার। স্যাঁতসেঁতে ভেজা ফ্লোরের ওপর একটি পাতলা প্লাস্টিকের পাটি দেওয়া হয়েছিল, যার ওপর শুয়ে থাকলে হাড়ের ভেতরে ঠান্ডা ঢুকে যেত।
১৬টি পুরো বছর আমি খালি পায়ে মাটির স্পর্শ পাইনি, মুক্ত বাতাস বুক ভরে নেওয়ার ভাগ্য আমার হয়নি। সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল এর নীরবতা। কোনো পাখির ডাক নেই, গাড়ির হর্ন নেই, মানুষের কণ্ঠস্বর নেই। মাঝে মাঝে দূর থেকে শুধু এক্সজস্ট ফ্যানের বিকট একঘেয়ে শব্দ ভেসে আসত – ভুঁউউউউ। এই শব্দ শুনতে শুনতে মাথার ভেতরের স্নায়ুগুলো ছিঁড়ে যেতে চাইত।
প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে দরজার নিচের একটি ছোট ফুটো দিয়ে স্টিলের থালায় খাবার ঠেলে দেওয়া হতো। আধা-সেদ্ধ ভাত আর মাটির গন্ধওয়ালা ডাল গিলে খেয়েই বেঁচে থাকতে হতো।
প্রথম দিকে দেওয়ালে নখ দিয়ে আঁচড় কেটে দিন গুনতাম। কিন্তু আঁচড়ের সংখ্যা যখন পাঁচশ পেরিয়ে গেল, তখন দিন গোনা ছেড়ে দিলাম। বুঝতে পারলাম, পৃথিবীর মানচিত্র থেকে আমার অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছে।
শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কোনো সীমানা সেখানে ছিল না। প্রথম দিকে প্রায় প্রতি সপ্তাহে আমাকে একটা অন্ধকার ঘরে টেনে নিয়ে যাওয়া হতো। সিলিং থেকে ঝুলন্ত শিকলে বেঁধে প্লাইয়ার্স দিয়ে চেপে ধরা হতো আমার হাত।
এক এক করে আমার হাতের নখগুলো উপড়ে ফেলা হলো। রক্তে ভিজে যেত ঠাণ্ডা সিমেন্টের মেঝের ওপর। পায়ের বুট দিয়ে থ্যাঁতলে দেওয়া হয়েছিল ডান হাতের আঙুলগুলো। মাসের পর মাস ভাঙা হাড়গুলো কোনো চিকিৎসা ছাড়া বিকৃতভাবে জোড়া লেগেছিল। আর ছিল ঘণ্টার পর ঘণ্টা শরীরে ইলেকট্রিক শক।
কিন্তু শারীরিক যন্ত্রণার চেয়েও মারাত্নক ছিল মানসিক ট্রমা। মধ্যরাতের স্তব্ধতা চিরে বিকট শব্দে মাইকে বাজানো হতো কান্নার আওয়াজ। কোনো ছোট্ট শিশুর আর্তনাদ, কিংবা কোনো নারীর কান্নার আকুতি। মনে হতো, পাশের ঘরেই বুঝি আমার ছোট মেয়েটাকে এনে নির্যাতন করা হচ্ছে!
আমি দরজায় থাবড়ে চিৎকার করতাম। আর কারারক্ষীরা দরজার ফুটো দিয়ে তাকিয়ে হেসে বলত – তোর মেয়েটা তো প্রতিদিন কাঁদছে। তোর বউ অন্য জায়গায় বিয়ে করে ফেলেছে। আর তোর বুড়ো বাবা কাল মারা গেছে, লাশের খবরও কেউ নেয়নি! এই বিষাক্ত মিথ্যাগুলো হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধত। মেঝের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে আল্লাহর কাছে শুধু মৃত্যু ভিক্ষা চাইতাম।
আমি যখন মাটির নিচে তিল তিল করে মরেছি, বাইরে আমার পরিবারের ওপর দিয়ে তখন বয়ে যাচ্ছিলো এক ধ্বংসাত্মক কালবৈশাখী। একটি মানুষকে ১৬ বছর ধরে গুম করে রাখা মানে শুধু তাকে শাস্তি দেওয়া নয়, তার পুরো পরিবারকে জ্যান্ত কবর দেওয়া।
আমার স্ত্রী সাহানা, রাজপ্রাসাদের সুখে বেড়ে ওঠা মেয়েটি এক মুহূর্তে রাজপথের লড়াকু নারীতে পরিণত হয়েছিল। আমার নিখোঁজ হওয়ার পরদিন থেকেই সে ছোট বাচ্চাকে কোলে নিয়ে ঘুরেছে হাইকোর্টের বারান্দায়। সংবাদ সম্মেলন করেছে একের পর এক। কিন্তু বিচারালয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা উপহাস করে বলত – উনাকে তো কেউ আটক করেনি। উনি হয়তো পরকীয়ায় ব্যর্থ হয়ে লুকিয়ে আছেন!
আদালতের বারান্দায় দৌড়াতে দৌড়াতে জমানো সব টাকা-পয়সা শেষ হয়ে গেল। সামাজিকভাবে সম্পূর্ণ একঘরে করে দেওয়া হয়েছিল তাদের। কোনো বাড়িওয়ালা গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবারকে বাসা ভাড়া দিতে চাইত না। বারবার বাসা বদলাতে হয়েছিল তাকে।
আমার বৃদ্ধ বাবা, যিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ছিলেন। প্রতিদিন লাঠি হাতে নিয়ে প্রেস ক্লাবের সামনে গুম হওয়া পরিবারের মানববন্ধনে এসে দাঁড়াতেন। প্রতিটা থানার জিডি রেজিস্টার আর মর্গের হিমঘরে ঘুরে ঘুরে ছেলের সন্ধান করেছেন।
২০১৮ সালের এক কনকনে শীতের রাতে তিনি স্ট্রোক করে মারা যান। মৃত্যুর আগের মুহূর্তেও তিনি অবশ চোখ মেলে দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন – একবার খোকা বলে ডাক শোনার আশায়।
আমার ছোট ভাই সোহেল। যে ভাইয়ের বিচারের দাবিতে রাজপথে নেমেছিল। ২০২১ সালের এক সমাবেশে পুলিশের ছররা গুলিতে আহত হয়। আইনি জটিলতা ও গ্রেফতারের ভয়ে চিকিৎসা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত হাঁটুর নিচ থেকে তার ডান পা কেটে ফেলতে হয়েছিলো।
সবচেয়ে মর্মান্তিক পরিণতি হয়েছিল আমার বৃদ্ধা মায়ের। সন্তানের শোকে অনবরত কাঁদতে কাঁদতে আর প্রদীপের আলোয় দরজার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে মায়ের দুটো চোখই অন্ধ হয়ে যায়। মা দেখতে পেতেন না। কিন্তু প্রতিদিন সেজদায় গিয়ে বলতেন – আল্লাহ, খোকাকে দেখার শক্তি চোখ থেকে কেড়ে নিয়েছ নাও, অন্তত একবার তার মা ডাকটা শোনার সুযোগ দিও।
আমার ছয় বছরের মেয়েটি আর গর্ভে থাকা সদ্যোজাত ছেলেটি বাবার পরিচয়হীন এক অভিশপ্ত শৈশব পার করল। স্কুলে সহপাঠীদের বিষাক্ত প্রশ্নের সামনে সবসময় তাদের মাথা নিচু করে থাকতো। দীর্ঘ ১৬টি বছর আমাদের ঘরে কোনো ঈদ আসেনি, কোনো উৎসবে আলো জ্বলেনি।
ষোলোটি বছর। অর্থাৎ ৫৮৪৪টি দিন আর রাত! আমি আয়নাঘরের সেই ৪ বায় ৬ ফিটের বাক্সে নিজের যৌবন, স্বাস্থ্য আর স্মৃতি হারিয়ে এক জীবন্ত কঙ্কালে পরিণত হয়েছিলাম।
২০২৪ সালের জুলাই মাসের শেষ দিকে হঠাৎ আয়নাঘরের পরিবেশে এক অদ্ভুত অস্থিরতা টের পেলাম। কারারক্ষীদের হাঁটার শব্দে আতঙ্ক, রেডিওতে ফিসফিসানি আর বাইরে থেকে মৃদু টিয়ারগ্যাসের গন্ধ এক্সজস্ট ফ্যান দিয়ে ভেতরে ঢুকছিল।
আগস্টের প্রারম্ভে শুনতে পেলাম প্রহরীদের ফিসফিসানি – পরিস্থিতি ভালো না, ম্যাডাম নাকি দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছে!
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরে একঝাঁক পাখি যেন ডানা মেলে উঠল। ফ্যাসিবাদ পরাজিত হয়েছে? আমার চোখ দিয়ে অঝোরে জল ঝরতে লাগল।
৫ই আগস্টের মধ্যরাত পার হয়ে ৬ই আগস্টের প্রাক্কালে এল সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত।
বাইরের করিডোরে অনেক মানুষের ভারী বুটের শব্দ আর চিৎকার – তাড়াতাড়ি তালা ভাঙো! ভেতরে কারা আছে দেখো!
চাবি না পাওয়ায় বিকট শব্দে হাতুড়ি আর কাটার দিয়ে আমার কক্ষের তালা ভাঙা হলো। ক্যাঁঅঅঅছ! বিকট শব্দে ১৬ বছর ধরে বন্ধ থাকা লোহার দরজাটা খুলে গেল!
বাইরের তীব্র আলো এসে আমার অন্ধপ্রায় চোখে ধাঁধা লাগিয়ে দিল। কিছু তরুণ ছাত্র আর সাধারণ মানুষ ভেতরে ঢুকে এলো। আমার দীর্ঘ দাড়ি, শীর্ণ কঙ্কালসার শরীর আর গায়ে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে তারা স্তব্ধ হয়ে গেল। একজন তরুণ ছাত্র কেঁদে ফেলে আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল – আপনি কে ভাই?
আমি শুকনো কণ্ঠনালী দিয়ে বহু কষ্টে উচ্চারণ করলাম – আমি… আমি একজন মানুষ। ১৬ বছর আগে আমাকে এখান নিয়ে আসা হয়েছিল। বাংলাদেশ কি স্বাধীন হয়েছে?”
তারা উচ্চস্বরে কেঁদে উঠে বলল – হ্যাঁ ভাই! দেশ স্বাধীন হয়েছে! স্বৈরাচার পালিয়ে গেছে! আপনি মুক্ত!
ষোলো বছর পর প্রথম আমার চোখে পড়ল খোলা আকাশ আর তাজা বাতাস। মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে আমি আমার জন্মভূমির সোঁদা মাটিকে চুমু খেলাম।
ভোরে যখন আমাকে আমার পুরনো বাড়ির সামনে নিয়ে যাওয়া হলো, এলাকাটা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। দরজায় গিয়ে কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে এক প্রবীণ, অন্ধ নারীর কাঁপানো কণ্ঠ ভেসে এলো – কে রে? খোকা নাকি?
মা চোখের আলো দিয়ে দেখতে না পেলেও মায়ের হৃদয় ঠিকই সন্তানকে চিনে নিয়েছিল! দরজা খুলতেই অন্ধ মা ছুয়ে ছুয়ে আমার মুখমণ্ডল স্পর্শ করতে লাগলেন – আমার খোকা এসেছে! আমার খোকা ফিরে এসেছে! মায়ের সেই আর্তচিৎকার আকাশ-বাতাস ভেদ করে গেল।
আমার স্ত্রী সাহানা থমকে দাঁড়িয়েছিল। তার চোখের ষোলো বছরের জমাট বাঁধা ক্লান্তি এক নিমেষে ভেসে গেল। আমার দুই সন্তান, তারা আজ প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণী। বাবার দিকে বিস্ময় আর অশ্রুসজল চোখে তাকিয়ে রইল।
আমার বাবা নেই, তাকে আমি শেষবিদায় জানাতে পারিনি। ভাইয়ের পা নেই, আমার পরিবারের জীবনের শ্রেষ্ঠ ষোলোটি বছর চুরি হয়ে গেছে। কিন্তু আজ যখন আমি ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ভোরের উদীয়মান রক্তিম সূর্যটার দিকে তাকাই, আমি আর কোনো অন্ধকার দেখি না। আয়নাঘরের মতো অভিশপ্ত অন্ধকূপগুলো আজ চিরতরে ধ্বংস হয়ে গেছে।
বাংলাদেশ আবার নিঃশ্বাস নিচ্ছে এক মুক্ত, বৈষম্যহীন এবং স্বাধীন ভোরে। এই ভোরের জন্য আমাদের রক্ত, অশ্রু আর ত্যাগ বৃথা যায়নি। আমার ও আমাদের আত্মত্যাগেই রচিত হয়েছে এক নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর।
আয়নাঘর থেকে ফিরে আসা রাজবন্দির জবানবন্ধি – যা শুধুই একটি গল্প নয়। ক্ষমতার অপব্যবহার, ন্যায় সততা ভূলে ক্ষমতার আসন আঁকড়ে রাখার এক নির্লজ্জ নগ্ন বাস্তবতার বিভৎস কাব্য।
ইতিহাস কাউকে ছাড় দেয় না। জীবনের স্বল্প পরিসরে ঘুরে ফিরে এসে সে আমাদের স্বচ্ছতা ও সততার শিক্ষা দেয়। অথচ সেই শিক্ষা থেকে শিক্ষা নিতেই আমাদের লজ্জা হয়। নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের মোহে আমরা একে একে জলাঞ্জলি দিই মানবতা, সততা – এমনকি ধর্মকেও।
এখনো কোনো রিভিউ নেই — প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!


