পাপ ও অনুশোচনার রূপকথা

পড়তে ৭ মিনিট

আমার মীরপুরের শেওড়াপাড়ার এই চারতলার ছোট্ট ফ্ল্যাটের বারান্দায় দাঁড়ালে ঠিক পাশেই কাজীপাড়ার ভাঙাচোরা বস্তিটা দেখা যায়। বর্ষায় যখন বস্তির চাল চুইয়ে পানি পড়ে, তখন নোংরা ড্রেনের পাশেই একটা ছোট্ট ঘরে টিমটিম করে জ্বলা লাইটের নিচে পুরো পরিবার একসাথে বসে ধোঁয়া ওঠা আটার রুটি আর বেগুন ভাজি খায়। সেখানে দারিদ্র্যতা আছে, কিন্তু এক অদ্ভুত স্বস্তি আছে সেখানে।

আর আমি? দুই টন এসি চালুর পরও আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমি তনিমা। মধ্যবিত্ত সমাজের চোখে এক আদর্শ গৃহিণী। যার স্বামী চাকরিজীবী। দুই সন্তান ভালো স্কুলে পড়ে। কিন্তু আয়নায় যখন আমি আমার নিজের চেহারার দিকে তাকাই, মনে হয় আমি কোনো মানুষ নই, যেন এক বিষাক্ত ছায়া।

ঢাকা শহরের ধুলোবালি, যানজট আর অলীক স্বপ্নের ভেতরে কীভাবে আমার পতন হয়েছিল, আজ সেই জঘন্য সত্যটা বলতেই নিজেরও ঘৃণা হচ্ছে।

আমাদের সংসারটা ছিল খিলগাঁও-মীরপুর রুটের কোনো সাধারণ লোকাল বাসের মতো – ক্লান্তিকর, ভিড়ে ঠাসা, কিন্তু ধীরগতিতে এগিয়ে চলা। আমার স্বামী তানভীর মতিঝিলের এক মাঝারি সাইজের কাপড়ের ট্রেডিং ফার্মে সামান্য বেতনে অ্যাকাউন্টসের কাজ করত। প্রতিদিন সকালে শেওড়াপাড়ার জ্যাম ঠেলে, শত মানুষের ধাক্কা খেয়ে বাসে উঠে অফিসে যেত, আর ফিরত রাত ৯টায়। উপহার বলতে ঈদের সময় নিউ মার্কেট বা গাউছিয়া থেকে তিন-চার হাজার টাকার শাড়ি আর চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট থেকে বাচ্চাদের জামা।

কিন্তু আমার চোখ আটকে থাকত ইনস্টাগ্রাম আর ফেসবুকে। ধানমন্ডি ১২/এ-র ক্যাফে, গুলশান-২ এর ল্যাভিশ রেস্টুরেন্ট, আর বনানী ১১ নম্বর রোডের ব্র্যান্ডেড শোরুমগুলোর ঝলমলে আলো আমাকে উন্মাদ করে তুলত। তানভীর যখন মাসের শেষে কাঁচাবাজারের হিসাব মেলাতে গিয়ে বলত, “তনিমা, ডাল আর সয়াবিন তেলের দাম যে হারে বেড়েছে, এ মাসে একটু হাত চেপে চলতে হবে,” তখন আমার রক্ত মাথায় উঠে যেত। মনে হতো, এই লোকটার সাথে থেকে আমার জীবনটা শেওড়াপাড়ার চাপা গলির নোংরা কাদার মতোই আটকে রইল।

ঠিক সেই বিষণ্নতার সুযোগ নিয়ে আমার ইনবক্সে আসে আরিয়ান। আরিয়ান। উত্তরার বিশাল নামকরা এক রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারের একমাত্র ছেলে। ইনস্টাগ্রামে তার রিলসগুলোতে শুধুই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার ডুপ্লেক্স বাড়ি, ৩০০ ফিটের এক্সপ্রেসওয়েতে স্পোর্টস কার চালানো আর দুবাই-থাইল্যান্ড ট্রিপের ছবি। সে যখন আমাকে নক দিয়ে বলল, “আপনাকে গুলশানের কোনো মেকআপ আর্টিস্ট সাজিয়েছে? এত সাধারণ একটা ছবিতেও আপনাকে ঢাকার কোনো মডেলের চেয়ে কম লাগছে না,” আমি তাতেই ভুলে গেলাম।

কথা বাড়ল। প্রথমে ইনবক্স, তারপর হোয়াটসঅ্যাপ, আর তারপর রাতের পর রাত তানভীর যখন ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ত, আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে গুলশানের উঁচু প্রাসাদের স্বপ্ন দেখতাম।

প্রথমবার আরিয়ানের সাথে দেখা করার কথা মনে পড়লে আজ নিজের গায়ে থুতু দিতে ইচ্ছে করে। তানভীরকে বানিয়ে বললাম – বাচ্চাদের কোচিংয়ের কাজে ফার্মগেটে যাচ্ছি। অথচ আমি উঠলাম আরিয়ানের হাঁকানো কালো রঙের দামী গাড়িতে। সে আমাকে নিয়ে গেল ধানমন্ডির এক আভিজাত্যপূর্ণ ক্যাফেতে। যেখানে এক কাপ কফির দাম আমার সংসারের দুই দিনের বাজার খরচের সমান।

আরিয়ান আমাকে উপহার দিল যমুনা ফিউচার পার্কের ব্র্যান্ডেড শোরুম থেকে নেওয়া দামী ব্যাগ আর একটি আইফোন। সেই আইফোনের স্ক্রিনে যখন আলো জ্বলত, আমার কাছে আমার শেওড়াপাড়ার ঘরটাকে অন্ধকার কবর মনে হতো।

ধীরে ধীরে আমি পাল্টে গেলাম। তানভীর রাত করে ক্লান্ত হয়ে ফিরে যদি বলত, “তনিমা, এক কাপ লাল চা দেবে? মাথাটা বড্ড ধরেছে,” আমি চিৎকার করে উঠতাম – “সারাটা দিন আমি দুই বাচ্চা সামলে মরি, তোমার কি দয়া দাক্ষিণ্য নেই? সামান্য চারুকলার মোড়ের চায়ের দোকানের মতো চালচলন তোমার, কোনো যোগ্যতা নেই এক কাপ চাও বানিয়ে খাওয়ার!”

আমার আট বছরের ছেলে আর ছয় বছরের মেয়েটা যখন আমার কাছে এসে বলত, “মা, আমাদের আগারগাঁও বিমান বাহিনী জাদুঘরে নিয়ে চলো না, পাপা তো সময় পায় না,” আমি ওদের ধমকে ঘরে পাঠাতাম। আমার মাথায় তখন শুধুই আরিয়ানের সাথে বনানীর কোনো রুফটপ রেস্টুরেন্টে ডেটিং কিংবা গুলশান সিটির শপিং প্ল্যান।

আমি ভুলে গিয়েছিলাম, আরিয়ান আমাকে যে টাকা দিচ্ছে, তা ভালোবাসা নয়। ঢাকা শহরের এক ধনকুবেরের রঙিন লালসার পারিশ্রমিক। সম্পর্কের এক বছর পার হতে না হতেই আমার ভেতরের লোভ আরো দানবীয় রূপ নিল। আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, এই টানাটানির সংসার, শেওড়াপাড়ার ছোট ফ্ল্যাট আর সৎ স্বামীটাকে ছুড়ে ফেলে আমি আরিয়ানের সাথে উত্তরার বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে উঠে যাব।

একদিন বিকেলে আরিয়ানের বনানীর প্রাইভেট অফিসে গিয়ে সোজা বললাম, “আরিয়ান, আমি আর এই তিলে তিলে মরা জীবন সইতে পারছি না। আমি তানভীরকে ডিভোর্স নোটিশ পাঠাচ্ছি। তুমি আমাকে তোমার কাছে নিয়ে নাও।”

আমার কথা শুনে আরিয়ান তার দামী রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো ভালোবাসা ছিল না। ছিল বিষাক্ত বিদ্রুপ। সে তার অ্যাশট্রেতে সিগারটা নিভিয়ে ঠান্ডা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল:

“হোয়াট এ জোক, তনিমা! যে মেয়ে নিজের খেটে খাওয়া সৎ স্বামীকে একটা আইফোন আর কফির লোভে ধোঁকা দিতে পারে, যে মা নিজের দুই বাচ্চাকে ফেলে অন্য পুরুষের বিছানায় আসতে পারে – তাকে আমি আমার সংসারের রানি বানাব? তুমি সত্যিই একটা আহাম্মক। আমি তোমার শরীরের দাম চুকিয়েছি, উপহার দিয়েছি। খেলা শেষ, এখন রাস্তা মাপো।”

আমার বুকের ভেতরটা যেন এক মুহূর্তে খালি হয়ে গেল। আমি তার পায়ে ধরে কান্নাকাটি করলাম, বলরামপুরী শাড়ির আঁচল বিছিয়ে ভিক্ষা চাইলাম। কিন্তু সে তার সিকিউরিটি গার্ড ডেকে আমাকে এক প্রকার চড়-থাপ্পড় আর ধাক্কা দিয়ে গুলশানের রোডে ফেলে দিল।

ঠিক তখন ঢাকা শহরে মুষলধারে বৃষ্টি নামছিল। প্রগতি সরণির কাদা আর নোংরা পানিতে ভেসে যাচ্ছিল আমার অহংকার। সিএনজি ভাড়া করার মতো টাকাও আমার পার্সে ছিল না। কারণ আমি এতকাল আরিয়ানের পেটিএম আর ক্যাশের ওপর বেঁচে ছিলাম। বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে আমি সেদিন বুঝেছিলাম – লোভ মানুষকে কোথায় এনে দাঁড় করায়।

আমার নিজের বাপের বাড়ি যাওয়ার মুখ ছিল না। সমাজে মুখ দেখানোর মতো স্থান ছিল না। তাই এক অচেনা অপরাধবোধের নরক বহন করে, রাত ৯টার দিকে কাঁদা মেখে আবার সেই শেওড়াপাড়ার চারতলার দরজায় গিয়ে কড়া নাড়লাম।

দরজা খুলল তানভীর। আমার ওই নোংরা, ভেজা আর বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে সে চমকে উঠল। কোনো সন্দেহ নয়, কোনো রাগ নয়। তার চোখে ফুটে উঠল চরম উদ্বেগ। সে তোয়ালে দিয়ে আমার মাথা মুছে দিতে দিতে বলল, “কোথায় ছিলে তনিমা? ফোনটাও বন্ধ ছিল! আমি তো ভেবেছি কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে। বৃষ্টিতে এভাবে ভিজেছ কেন?”

বাচ্চা দুটো ‘মা মা’ করে এসে আমার ভেজা শাড়ি জড়িয়ে ধরল। তানভীর যদি সেদিন আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলত। আমাকে চাবুক দিয়ে মারত কিংবা বাড়ি থেকে বের করে দিত – আমি হয়তো বেঁচে যেতাম। কিন্তু তার ওই নিষ্পাপ সরল বিশ্বাস আর সীমাহীন ভালোবাসা আমার বুকের ভেতর তপ্ত সিসার মতো ঢেলে দিল।

আজও আমি এই ঘরেই আছি। তানভীর আগের মতোই প্রতিদিন সকালে কাঁচাবাজারের থলে হাতে নিয়ে শেওড়াপাড়ার বাজারে যায়। কষ্ট করে টাকা জমিয়ে পহেলা বৈশাখে আমার জন্য দেশী দশের একটা সাধারণ সুতি শাড়ি কিনে এনে লাজুক মুখে বলে, “তোমার গায়ে লাল রঙটা খুব মানায়, তনিমা।”

সে যখন এই কথা বলে, আমার মনে হয় সেই শাড়িটা নয়, আমি কোনো বিষাক্ত কাফনের কাপড় গায়ে জড়িয়ে আছি।

বাচ্চা দুটো যখন রাতে আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমায়, আমি নিজের হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠি। এই হাতে আমি ওদের ভালোবাসার বদলে বিশ্বাসঘাতকতা কুড়িয়েছিলাম। প্রতি রাতে যখন মীরপুরের শান্ত আকাশে কোনো গাড়ির হর্ন শোনা যায়, আমার মনে পড়ে যায় গুলশানের সেই নোংরা অপমান।

পাশে তানভীর পরম শান্তিতে ঘুমায়। আর আমি অন্ধকার সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে চোখ দিয়ে জল ফেলি। আমার ক্ষমা নেই। আমি ঢাকা শহরের চকচকে আলোর মোহে নিজের স্বর্গটাকে নরক বানিয়ে ফেলেছি। আজ আমি বেঁচে আছি সত্যি, কিন্তু এই ঘরের প্রতিটি বিশ্বাস, প্রতিটি ভালোবাসা আমাকে প্রতিদিন তিলে তিলে হত্যা করে।

☆☆☆☆☆ 0 / ৫ (0 টি রিভিউ)
★★★★★

এখনো কোনো রিভিউ নেই — প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!

মোহাম্মদ শওকত আকবার

আমি মোহাম্মদ শওকত আকবার… একজন লেখক, কবি, প্রযুক্তি উদ্ভাবক আর কন্টেন্ট নির্মাতা – সবকিছু মিলিয়ে নিজেকে বলি, একজন সৃষ্টিশীল যাযাবর। শব্দের সাথে, স্ক্রিপ্টের সাথে, আর মানুষের সাথে সংযুক্ত থাকার এক নিরন্তর প্রচেষ্টা। showkatbd.com আমার নিজের তৈরি একটি প্ল্যাটফর্ম – যেখানে আমি সংরক্ষন করেছি আমার চিন্তা, চেতনা, ভালোবাসা আর প্রযুক্তির প্রয়োগ। শব্দ আর কোডের মিলনে এক ব্যতিক্রমধর্মী বাংলা প্লাটফর্ম। আমি লিখি, কোড করি, ভাবি, এবং আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে ভালোবাসি। প্রযুক্তি, সাহিত্য, ধর্ম - এক আঙিনায় সকল কিছু।

মন্তব্য করুন