আশা-নিরাশার ছত্রিশ জুলাই, অতঃপর বাংলাদেশ
— মোহাম্মদ শওকত আকবার | একটি উন্মুক্ত মতামত
গণবিস্ফোরণ ও ক্যালেন্ডারের বাইরে ৩৬ জুলাই
ক্যালেন্ডারের পাতায় ২০২৪। মাস জুন-জুলাই। কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে রাজপথে অবস্থান দেশের সাধারণ ছাত্রসমাজের। আকস্মিক ছাত্রদের সেই ন্যায্য আন্দোলন রূপ নিল ১৬ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, রাগ আর দীর্ঘশ্বাসের দাবানলে। ঐদিকে দল-মত নির্বিশেষে দেশের সকল স্তরের মানুষ মনে-প্রাণে চেয়েছিল দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকারের হাত থেকে মুক্তি। সেই গণআকাঙ্ক্ষার ওপর ভর করেই আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠলো সমগ্র বাংলাদেশ।
দমন-পীড়নে রক্তে লাল হলো রাজপথ, শহীদ হলো কলেজ-ভার্সিটিতে পড়ুয়া অসংখ্য ছাত্র। খালি হলো মায়ের বুক। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে সেই আন্দোলনে একাত্মতা প্রকাশ করলো কৃষক, শ্রমিক, রিকশাচালক থেকে শুরু করে সমগ্র জাতি। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া – সবার কণ্ঠে একটাই দাবি, ফ্যাসিবাদের পতন। অবশেষে লাখো কণ্ঠের গর্জনে ও অসংখ্য প্রাণের বিনিময়ে এলো সেই কাঙ্ক্ষিত ৫ আগস্ট। পতন হলো শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের স্বৈরাচারী শাসনের। ছাত্রদের সেই রক্তের বন্যায় কালপঞ্জির হিসাব এলোমেলো হয়ে গেল। জুলাই মাস আর ক্যালেন্ডারের ৩১ তারিখে আটকে রইল না; ৩১-এর পর শুরু হলো ৩২, ৩৩, ৩৪, ৩৫ গণনা আর শেষমেশ ইতিহাসের পাতায় জন্ম নিল অবিস্মরণীয় ‘৩৬ জুলাই’।
নতুন ভোরের উল্লাস ও মিথ্যে আশার কুহক
অগাস্টের ৮ তারিখ। চারদিকে তখন নতুন ভোরের আলোর ছটা। বিশ্ববরেণ্য নোবেলজয়ী লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গড়া হলো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, ক্ষমতার আসনে উপবিষ্ট হলেন তিনি। নতুন বাংলাদেশের বাজনায় চারদিক পুলকিত, আনন্দিত। হাটে-মাঠে, চায়ের আড্ডায়, সোশাল মিডিয়ায় কিংবা টিভি স্ক্রিনে – তখন শুধুই বিজয়ের উল্লাস। ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদ সরকারের শৃংখল থেকে মুক্তির উল্লাস। সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভাবলো – এই বুঝি নতুন করে সেজে উঠলো আমাদের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’! সব অন্যায়, অবিচার, জুলুম আর অনাচারের হয়তো চিরতরে দাফন হয়ে গেল।
আসলে আমরা সাধারণ মানুষ চিরকাল বড়ই সহজ-সরল। সবসময় একটু শান্তির স্বপ্ন দেখি। একটা শান্তিময় পরিবেশ, দুমুঠো ভাত খেয়ে একটু নিশ্চিন্তে মাথা গোঁজার স্বপ্ন, সুন্দর করে বাঁচার স্বপ্ন। কিন্তু স্বপ্নের তো কোনো আগা-গোড়া থাকে না! স্বপ্নের কোনো নির্দিষ্ট সীমানা নেই, শুরু বা শেষও কেউ বলতে পারে না। এই অবোধ স্বপ্নকে পুঁজি করেই আমাদের সারা জীবন পার করতে হয়, আর শেষমেশ শূন্য হাতেই হয় জীবনাবসান। আমাদের ভাঙ্গিয়ে মাঝপথে অর্থ-বিত্ত, মান-সম্মান আর সুখের সাথে সহবাস করে লালে লাল হয়ে যায় এক শ্রেণির মানুষ। তারা ‘নেতা’, তাদের মুখে বড় বড় জ্ঞানের বাণী, দেশ ভালোবাসার মিথ্যে ছলনা। আমাদের মতো সাধারন জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে তাদের নিজেদের সাদ্দাতের জান্নাত তালাশ।
বিপ্লবের পেছনের আসল কারিগর ও মুখের মুখোশ
কিন্তু বিজয়ের ঘোর কাটতে খুব বেশি সময় লাগলো না। দিন যত এগোতে থাকলো, নির্মম সত্যটা তত বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠলো। ইতিহাস আসলে বারে বারে নিজেকেই পুনরাবৃত্তি করে। প্রতিটা বড় আন্দোলনের পেছনে লুকিয়ে থাকে অন্য এক শ্রেণীর কুটিল স্বার্থ। সাধারণ মানুষ যখন রাজপথে বুকের রক্ত ঢেলে দেয়, তখন নেপথ্যের সেই স্বার্থান্বেষী মহলটি ব্যস্ত হয়ে উঠে নিজের আখের গোছানোর।
তাদের চিন্তা জুড়ে কখনোই দেশের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ বা জাতির কল্যাণ থাকে না। তারা আন্দোলনকে উসকে দেয়, বিপ্লবী সাজে, যুদ্ধের আগুনে কাঠ জোগায় – কেবল নিজেদের স্বার্থ হাসিলে। ৩৬ জুলাই তেমনি এক গভীর প্রতারণার অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে ধীরে ধীরে আন্দোলনের নেপথ্যের ধোঁয়াশা কাটতে শুরু করলো। কে বা কারা ছিল সেই আন্দোলনের চালিকাশক্তি? কী ছিল তাদের আসল রূপ আর গোপন উদ্দেশ্য? বিপ্লবের আড়ালে যাদের মুখগুলো ঢাকা ছিল, ধীরে ধীরে তা পরিষ্কার হয়ে ফুটতে লাগলো।
সেসব বিপ্লবীরা, সেইসব বুদ্ধিজীবীরা খুঁজে পেলো অর্থের খনি। যাদের শেভ করার অর্থ ছিল না তারা ফেসিয়াল শুরু করলো, যাদের বাসের ভাড়া সংগ্রহের যুদ্ধ ছিল তারা হেলিকপ্টারে যাতায়াত শুরু করলো, একটি ভালো মানের টি-শার্ট ক্রয়ের মুরোদ ছিল না যাদের—তারা বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের টি-শার্ট ও জুতায় নিজেদের সাজাতে শুরু করলো। অতঃপর যা হলো—একটি political পার্টির জন্ম। যে উকিল সাহেব সাংবাদিকতার লেবাসে মিথ্যে সংবাদ পরিবেশন করে বাংলাদেশে ‘রাজাকার’ উপাধির বিস্তার করে কিছু লোককে মিথ্যা অপবাদে ধরাধাম থেকে বিদায় করার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, তিনিও দেশের আইনকে যেন ধর্ষণ করে ছাড়লেন। অল্প কিছু সময়ে জাতি দেখলো সেসব লোকদের পাতানো এক নির্লজ্জ খেলা।
ড. ইউনূস সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণ
ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্ত হতে দেশের সব স্তরের মানুষ যে আত্মত্যাগ করেছিল, তার বিনিময়ে জাতি হয়ে উঠলো চরমভাবে আশাহত। প্রশ্ন উঠতে শুরু হলো—জুলাই যোদ্ধা কিংবা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছ থেকে অবশেষে কী পেল এই জাতি?
যে নোবেলজয়ীর ওপর আন্তর্জাতিক মহল ও দেশের সাধারণ মানুষের অগাধ আস্থা ছিল, যিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এক নিমেষে উঁচুতে তুলে ধরতে পারতেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকারের কাছে জাতির প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। দেশের মানুষ চেয়েছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি, নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক স্বস্তি এবং এক নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য সংস্কার। ড. ইউনূস সরকার কি চাইলেই দেশের এই সংকটকালে আরও অনেক ভালো কিছু উপহার দিতে পারতেন না? অবশ্যই পারতেন। তাঁর মতো আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্বের কাছে জাতির এইাওয়াটি কোনো বিলাসিতা ছিল না, বরং ছিল সময়ের দাবি।
কিন্তু কার্যকর উদ্যোগের অভাব, সিদ্ধান্তহীনতা এবং জুলাই আন্দোলনের গতিপথকে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের হাতিয়ার বানাতে দেওয়ার কারণে সাধারণ জনগণের সেই প্রত্যাশার পারদ হতাশায় রূপ নিলো। কেন বা কোন বাধ্যবাধকতায়, কিংবা কাদের রক্তচক্ষু ও লাল চাহনিতে ইউনূস সাহেবের মতো ব্যক্তিত্ব চুপসে গেলেন—তা এই সহজ-সরল জাতি আজও বুঝে উঠতে পারলো না।
কী পেল জাতি?
ফ্যাসিবাদী সরকারের পতনের পর শেষ পর্যন্ত এই জাতি ঠিক কী পেল? আজ হয়তো উত্তরটা সবার কাছেই স্পষ্ট। আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা সেই তথাকথিত বাঘা বাঘা নেতারা রাতারাতি হয়ে উঠলো আঙুল ফুলে কলাগাছ। তাদের ক্ষমতার মোহ, ভাগ-বাটোয়ারা আর চেয়ার দখলের নোংরা রাজনীতি জাতির সামনে এক নগ্ন সত্য হয়ে দেখা দিল।
আর দিনশেষে কী পেল সেই সাধারণ জনগণ, যারা রক্ত দিয়েছিল?
যে শহীদেরা বুকে গুলি নিয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েছিল, তাদের নিঃস্ব ও অসহায় বাবা-মা পেলেন কেবল কিছু বাঁধাধরা সান্ত্বনা, আর কিছু ক্যামেরার সামনে দাঁড় করানো প্রতিশ্রুতি। আর পুরো জাতি উপহার পেলো এক মস্ত বড় ‘মুলা’! স্বৈরাচারের পতন হলো ঠিকই, নতুন নতুন মুখ ক্ষমতায় আসলো, কিন্তু সাধারণ মানুষের কপাল আর ভাগ্যের চাকাটা সেই আগের মতোই আঁধারে বন্দি হয়ে রইল।
ইতিহাসের বিচার ও রক্তে লেখা সত্য
ইতিহাসের নির্মম পরিহাস এই যে, বারবার শাসক বদলায়, পতাকার রঙ বদলায়, কিন্তু আমজনতার পরিণতি কখনো বদলায় না। ৩৬ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান সাধারণ মানুষকে যে নতুন ভোরের আশা দেখিয়েছিল, তা আজ কেবলই এক অধরা মরীচিকা। রক্তের ওপর পা দিয়ে তৈরি হওয়া নতুন সুযোগ সন্ধানীদের এই ক্ষমতার মোহ হয়তো সাময়িকভাবে কাউকে বিলাসী জীবন কিংবা রাজপ্রাসাদ এনে দিতে পারে, কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না।
শহীদের রক্তের গন্ধ আর মা-বাবার দীর্ঘশ্বাস কখনো বাতাসেই মিলিয়ে যায় না; তা একদিন না একদিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায় বিশ্বাসঘাতকদের। এই প্রতারণা ও আশাহতের ইতিহাস আগামী দিনের পথচলায় সাধারণ জনগণকে আরও সতর্ক করবে। ‘৩৬ জুলাই’ কেবল একটি স্বৈরাচারের পতন হিসেবে নয়, বরং বিপ্লবের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সুযোগ সন্ধানীদের মুখোশ উন্মোচনের এক চিরন্তন দলিল হয়ে টিকে থাকবে বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায়।
এখনো কোনো রিভিউ নেই — প্রথম রিভিউটি আপনিই দিন!


